অস্থির নিত্য পণ্যের বাজার: 'সব জেনেও কিছু করতে পারছি না'

অস্থির নিত্য পণ্যের বাজার: ‘সব জেনেও কিছু করতে পারছি না’

অর্থনীতি

রাজশাহী টাইমস ডেক্সঃ

সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত চাল না থাকায় আড়তদার ও মিল মালিকদের দৌরাত্ম দেখেও কিছু করতে পারছে না সরকার। মঙ্গলবার (২৬ জানুয়ারি) রাজধানীর খামারবাড়িতে এক অনুষ্ঠানে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক এসব কথা জানান।

তিনি জানান, সাড়ে তিন লাখ টন উদ্বৃত্ত থাকার পরও কৃত্রিম সংকটে ৫০ টাকায় আলু কিনতে হয়েছে ভোক্তাকে। আর প্রতিবেশী ভারতের ওপর অতিনির্ভরতায় গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছিলো পেঁয়াজও। নিত্য পণ্যের বাজারে এসব অরাজকতা বন্ধে কৃষিমূল্য কমিশন গঠন করে সারাবছর নিত্য পণ্যের দাম নির্ধারণ ও বাজার তদারকির সুপারিশ করছেন কৃষিপণ্যের বাজার বিশ্লেষকরা।

সদ্যবিদায়ী বছরে চাল, আলু ও পেঁয়াজের দামে নাভিশ্বাস ওঠে ভোক্তার। যদিও ধান ও আলু উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশ। সরবরাহ সংকটের অজুহাতে পাইকারি বাজারে প্রতিকেজি আলুর দাম ছাড়ায় ৫০ টাকা। ভারত রপ্তানি বন্ধ করায় পেঁয়াজের দাম ছাড়ায় ১০০ টাকা। আর আমনের ভরা মৌসুমে ৫০-৬০ টাকায় কিনতে হচ্ছে প্রতি কেজি চাল। আমদানিতেও পাল্টায়নি সেই চিত্র। নিত্য পণ্যের বাজারের এমন হ য ব র ল অবস্থায় দাম বাড়ার কারণ অনুসন্ধানে মাঠে নামে সরকার।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল জানায়, ২৭ জন বিজ্ঞানী ও গবেষক ১২ নভেম্বর থেকে ২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত অনুসন্ধান চালায়। অনুসন্ধানে চালের জন্য নওগাঁ, শেরপুর, কুমিল্লা ও ঢাকা জেলা, আলুর ক্ষেত্রে মুন্সিগঞ্জ, বগুড়া, রংপুর ও ঢাকা জেলা এবং পেঁয়াজের ক্ষেত্রে ফরিদপুর পাবনা, নাটোর ও ঢাকা জেলাকে বাছাই করা হয়। অনুসন্ধানে দাম বাড়ার জন্য ব্যবসায়ীদের কারসাজির বিপরীতে সরকারের দুর্বল অবস্থানের বিষয়টি উঠে আসে।

অনুসন্ধানে ধান-চাল, আলু ও পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির নেপথ্যে যে তথ্য পেয়েছে গবেষক দল:

চালের দাম বৃদ্ধির কারণ:

১. প্রায় সকল কৃষকই ধান কর্তনের প্রথম মাসের মধ্যে বাজারজাতযোগ্য উদ্বৃত্তের একটা বড় অংশ বিক্রি করে দেন। 
২. গত বোরো মৌসুমে ধান বিক্রির ধরনটি পরিবর্তিত হয়েছে। এ মৌসুমে কৃষকরা তাদের ধান মজুদ থেকে ধীরে ধীরে বিক্রি করেছেন।

৩. সরকার কর্তৃক কম চাল সংগ্রহ ও যথাসময়ে আমদানির ব্যর্থতা এবং প্রয়োজনীয় বাজার হস্তক্ষেপের অভাব মূল্য বৃদ্ধির কারণ ছিল। 
ধানের বাজারে মূল্য বৃদ্ধির কারণ:

১. বড় মিল মালিক ও ব্যবসায়ীদের আধিপত্য ও অসম প্রতিযোগিতা। ২. আমন মৌসুমে ধান উৎপাদনে ঘাটতির আশঙ্কা। ৩. ধান চাষের ব্যয় ও প্রক্রিয়াজাতকরণের খরচ বৃদ্ধি। ৪. ক্রমবর্ধমান মৌসুমী ব্যবসায়ী বৃদ্ধি। ৫. প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উৎপাদন হ্রাস।

আলুর মূল্য বৃদ্ধির কারণ:

১. ভবিষ্যতে মূল্য বৃদ্ধির আশায় কৃষক ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে আলুর মজুদ ও হিমাগার থেকে আলুর কম সরবরাহ। ২. হিমাগারে মজুদকৃত আলুর পুনঃপুন হস্তান্তর। ৩. পাশের কয়েকটি দেশে আলু রপ্তানি। ৪. মৌসুমী ব্যবসায়ী কর্তৃক আলুর বিপুল মজুদ ও কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি। ৫.আলুর বাজারে সরকারের সীমিত নিয়ন্ত্রণ ও বাজারের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে তথ্যের অভাব। ৬. বর্ষার মৌসুমের ব্যাপ্তি দীর্ঘতর হওয়ায় সবজির উৎপাদন হ্রাস ও আলুর চাহিদা বৃদ্ধি। ৭.টিসিবি কর্তৃক আলুর বিতরণ অপ্রতুল।

পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির কারণ:

১. দেশীয় অসাধু বাণিজ্য সিন্ডিকেট দ্বারা বাজারে কারসাজি। ২. ভারতীয় রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা অথবা অতিমাত্রায় ভারতের উপর পেঁয়াজে আমদানির জন্য নির্ভরতা। ৩. আমদানির জন্য পেঁয়াজের বিকল্প উৎসের সন্ধানে দ্রুত কার্যক্রমের অভাব। ৪. গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ ও মুড়িকাটা পেঁয়াজের সীমিত উৎপাদন।

এই তিন নিত্য পণ্যের দাম অস্থিরতা কারণ খোজার পাশাপাশি ধান-চাল, আলু ও পেঁয়াজ বাজার নিয়ন্ত্রণে আলাদা সুপারিশও করেছে বিএআরসি’র গবেষণা দলটি।

ধান-চাল নিয়ে সুপারিশ: ১. ধান-চাল সংগ্রহ পদ্ধতির আধুনিকায়ন করা, কৃষকের কাছ থেকে সরাসরিভাবে ধান সংগ্রহ করা ও মিলারদের মাধ্যমে তা চালে পরিণত করা। ২. চিকন ও মোটা দানার চালের জন্য সরকারের পৃথক ন্যূনতম সহায়তা মূল্য (এসএমপি) ঘোষণা করা। ৩. ন্যূনতম ২৫ লাখ টন চাল সংগ্রহ করা এবং মোট উৎপাদনের প্রায় ১০ শতাংশ সংগ্রহ করার সক্ষমতা অর্জন করা যাতে করে সরকার বাজারে কার্যকরভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারে। ৪. বাফার স্টক হিসেবে সরকার কর্তৃক প্রতি মাসে কমপক্ষে ১২ দশমিক ৫০ লাখ টন চাল মজুদ নিশ্চিত করা। ৫. উৎপাদন ব্যয়ের উপর কমপক্ষে ২০ শতাংশ মুনাফা বিবেচনা করে ধান-চালের সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ করা।

আলু নিয়ে সুপারিশ:

১. কৃষি মূল্য কমিশন স্থাপন ও পরে সর্বাধিক ও সর্বনিম্ন সাপোর্ট মূল্যের ঘোষণা প্রদান। ২. উৎপাদন, চাহিদা ও সরবরাহ ও দামের তথ্যাবলীতে অস্পষ্টতা অপসারণ । ৩. হিমাগারে আলুর সংরক্ষণ ও অবমুক্তকরণ সরকার কর্তৃক নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির মধ্যে রাখা। ৪.আলুর বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টিকারীদের সনাক্তকরণ ও তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা। ৫. আলু ও আলু দ্বারা তৈরি বিভিন্ন পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা। ৬. বিদেশে চাহিদাকৃত আলুর জাতের উন্নয়ন ও যেসব আলু প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবহৃত হয় সেসব আলুর জাত উন্নয়নের ব্যবস্থা করা।

পেঁয়াজ নিয়ে সুপারিশ:

১.অসাধু বাণিজ্য সিন্ডিকেট সনাক্তকরণ করে তাদের বিচারের মুখোমুখি করা ২.সঙ্কটকালীন সময়ে পেঁয়াজ আমদানির জন্য দ্রুত একাধিক রপ্তানিকারক দেশের সন্ধান করা। ৩.অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে আমদানি নির্ভরতা হ্রাস করা। ৪.কৃষি মূল্য কমিশন গঠনের মাধ্যমে সারা বছর বাজারে পেঁয়াজের দাম নির্ধারণ ও তদারকি করা। ৫.বাজারে পেঁয়াজের দাম হঠাৎ বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের জন্য অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ও মজুদের অগ্রিম ব্যবস্থাপনা করা।

গবেষণায় বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সরকারের দুর্বলতা অবস্থানের বিয়ষটি স্বীকার করে নেন কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক। বলেন, আমাদের কাছে যদি ১০ লাখ টন চাল থাকতো। তাহলে আমরা ওএমএস কার্যক্রম আরো জোরদার করতে পারতাম। তাহলে বাজারে একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়ত। কিন্তু আমাদের গুদামে মাত্র পাঁচ লাখ টন চাল মজুদ আছে। এই সুযোগটাই নিচ্ছে মিলমালিকরা ও আড়তদাররা।

আমদানি উন্মুক্ত করে দিয়েও খুব একটা সুফল আসছে না মন্তব্য করে কৃষিমন্ত্রী বলেন, চাল আমদানির উপর ট্যাক্স কমিয়ে ২৫ শতাংশ করেছি। কিন্তু বিশ্ববাজারে চালের যে দাম তাতে আমদানিকারকরা বলছে লাভ হচ্ছে না। তারা আমদানি শুল্ক আরো কমানোর কথা বলছে। এবারের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আবারো আগামী বোরো মৌসুমে পর্যাপ্ত ধান-চাল কেনার ঘোষণা দেন কৃষিমন্ত্রী।

অনুষ্ঠানে কৃষিসচিব মেসবাহুল ইসলাম’সহ কৃষি মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

মন্তব্য করুনঃ

আপনার মন্তব্য করুন :