আজ বিশ্ব রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট দিবস

আজ বিশ্ব রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট দিবস

আন্তর্জাতিক

আন্তর্জাতিক ডেক্সঃ

আজ বিশ্ব রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট দিবস। ১৮২৮ সালের এই দিনে রেড ক্রস-এর প্রতিষ্ঠাতা জিন হেনরি ডুনান্ট সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে জন্ম গ্রহণ করেন। এই মহান ব্যক্তিকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করার জন্য প্রতিবছর তার জন্মদিনটিকে বিশ্ব রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট দিবস হিসেবে সারা বিশ্বে উদযাপন করা হয়। বাংলাদেশেও এই দিবসকে সামনে রেখে দিনব্যাপী চলবে নানা আয়োজন।

শান্তিতে প্রথম নোবেল বিজয়ী তিনি। যুদ্ধে আহতদের সেবা দেবার প্রথম উদ্যোগও তাঁর। বিশ্ব মানবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেড ক্রসের প্রতিষ্ঠাতা জিন হেনরি ডুনান্ট। 

পুরো বিশ্বে তার দেখানো মানবতার পথে যুগে যুগে হেটেছে লাখো অনুসারী। বাংলাদেশও পিছিয়ে নেই। 

যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি বা সংকট। চারদিকে যখন গ্রহনকাল , সবাই নিজেকে কেবল গুটিয়ে নিতে চায়, তখন কিছু মানুষ নিঃস্বার্থভাবে এগিয়ে নিজের কষ্টের বিনিময়ে অন্যের মুখে হাসি ফুটিয়ে যাচ্ছেন। এই  স্বেচ্ছাসেবকরা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাজ করেন সারাবছর। তাদের পরিচয়, তারা রেডক্রিসেন্ট কর্মী ।

সবাই মিলে একত্রে এই পৃথিবীকে আরও সুরক্ষিত এবং আরও শান্তিপূর্ণ জায়গা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রতিশ্রুতি ও চেষ্টায় অপ্রতিরোধ্য হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি। 

এ বছর দিনটির প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে Be HumanKIND. Kind শব্দটির সাধারণ অর্থ ‘দয়া’ হলেও রেড ক্রস/রেড ক্রিসেন্ট ‘সহানুভূতি’ শব্দ ব্যবহারেই পছন্দ করে। কারণ, প্রতিষ্ঠানটির মূলনীতি-বিশেষত ‘মানবতা’র মর্মকথা এবং সমকালীন আন্তর্জাতিক মানবিক আচরণবিধির বার্তা হচ্ছে সাহায্য-সহযোগিতা পাওয়া দুর্গত/বিপদাপন্ন মানুষের অধিকার; কোনোভাবেই দয়া প্রদর্শন নয়।

তাই মানবিক প্রতিষ্ঠান হিসাবে রেড ক্রস বা রেড ক্রিসেন্ট অসহায় মানুষের প্রতি দয়া করে না; বরং তাদের দুর্দশায় সহানুভূতি জানাতেই সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়ায়। রেড ক্রস বিশ্বাস করে, মানুষকে দয়া করলে তার সাময়িক প্রয়োজন মেটে; কিন্তু সহানুভূতি জানালে একই মানুষের মধ্যে আশা জাগে, অবস্থা উত্তরণে তার মধ্যে আত্মবিশ্বাস জন্মায়। শুধু সহানুভূতি জানানোই নয়, মানুষের অসহায়ত্ব লাঘবে রেড ক্রস সব সময় তাদের সম্পৃক্ত, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ক্ষমতায়ন (এমপাওয়ার) করে, যা তাদের মানুষ হিসাবে সম্মানীয় ভাবতে অনুপ্রেরণা দেয়।

এক সময়ের যুবক হেনরি ডুনান্টের স্বপ্ন-ফসল যুদ্ধকালে মানবিক সেবা পরিচালনার জন্য রেড ক্রস প্রতিষ্ঠা হলেও আজ আর কেবল এ সংস্থার কার্যক্রম যুদ্ধকালেই সীমাবদ্ধ নেই। এখন রেড ক্রস বা রেড ক্রিসেন্টের সেবার ক্ষেত্র অনেক প্রসারিত। বিশ্বময় ঘটে যাওয়া নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর মানবসৃষ্ট যুদ্ধ-হানাহানির শিকার ও ক্ষতিগ্রস্ত অসহায় মানুষের সেবায় রেড ক্রস বা রেড ক্রিসেন্ট তৎপর। ২০২০ সালের পরিসংখ্যান অনুসারে, রেড ক্রস/রেড ক্রিসেন্ট প্রায় ৭০ কোটি মানুষকে বিভিন্ন মানবিক সেবা প্রদান করেছে। ২০২০ থেকে চলমান কোভিড মহামারিকালেও এ সংস্থার মানবিক সেবায় কোনো ভাটা পড়েনি; বরং অধিক ঝুঁকি নিয়ে সেবা অব্যাহত রেখে অসহায় মানুষের মানসপটে অবস্থান দৃঢ় করতে সক্ষম হয়েছে।

বাংলাদেশেও জাতীয় সোসাইটি হিসাবে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (বিডিআরসিএস) দুর্যোগকালীন জরুরি সেবা ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা ছাড়াও দেশব্যাপী বিপদাপন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে ঝুঁকিহ্রাস কার্যক্রম বাস্তবায়ন, হাসপাতাল ও মাতৃসনদ কেন্দ্র পরিচালনা, মুমূর্ষু রোগীর জন্য নিরাপদ রক্ত সংগ্রহ ইত্যাদি বহুমুখী কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালিত ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (সিপিপি) আজ সারা বিশ্বে দুর্যোগ মোকাবিলায় এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। বর্তমানে বিডিআরসিএস ১৯৯২ ও সর্বশেষ ২০১৭ সাল থেকে কক্সবাজারের ৩৩ শরণার্থী ক্যাম্পে অবস্থানকারী প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিভিন্ন মানবিক সহযোগিতা প্রদান করছে। এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নে রেড ক্রস/রেড ক্রিসেন্ট সহযোগী প্রতিষ্ঠান (আইসিআরসি, আইএফআরসি, বিভিন্ন জাতীয় সোসাইটি) সহযোগিতা করে থাকে। এছাড়া বিডিআরসিএস একটি নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসাবে আইসিআরসির সঙ্গে বিভিন্ন কারাগারে থাকা বিদেশি কয়েদিদের জন্য মানবিক সহায়তা ছাড়াও তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে সহযোগিতা করে থাকে।

পৃথিবীব্যাপী রেড ক্রস/রেড ক্রিসেন্ট পরিচালিত মানবিক সেবার বিশেষত্ব হলো, এসব সেবা কার্যক্রম বাস্তবায়িত হয় স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে। ১৯২ দেশে সম্পৃক্ত ১৪.৯ মিলিয়ন (প্রায় ১.৫ কোটি) রেড ক্রস/রেড ক্রিসেন্ট স্বেচ্ছাসেবক, যারা সবাই স্থানীয় ও অসহায় মানুষের খুব কাছের। স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও স্বেচ্ছাসেবকদের সম্পৃক্ত করায় সেবার মান যেমন সমৃদ্ধ হয়, তেমনি মানুষের জন্য পরিচালিত স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি (পুনর্বাসন, পুনরুদ্ধার ও উন্নয়ন/ঝুঁকিহ্রাস) কার্যক্রম টেকসই (সাসটেইনেবল্) হতে ভূমিকা রাখে।

১৮৫৯ সালে সলফেরিনোর যুদ্ধস্থল থেকে উদ্ভূত হয়ে হেনরি ডুনান্টের স্বপ্ন থেকে যে মানবিক প্রতিষ্ঠানের যাত্রা ঘটেছিল, ১৫৯ বছর পর তার অনেক প্রসার ঘটেছে। বিশ্বের যেখানেই অসহায় আর পীড়িত মানুষের আর্তনাদ আছে, রেড ক্রস বা রেড ক্রিসেন্ট সেখানেই অবিরত সেবা প্রদান করে যাচ্ছে। যুদ্ধ-দুর্বিপাকে কেউ যখন যেতে দ্বিধা করে, রেড ক্রস সেখানে সবার আগে এগিয়ে যায় সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে। রেড ক্রস থেমে থাকেনি চলমান ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে। চলমান যুদ্ধের প্রথম দিন থেকেই রেড ক্রস বিশ্বস্ত ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসাবে ইউক্রেনে অবস্থানকারী সব পক্ষকে মানবিক সহায়তা প্রদান করছে।

১৮৬৩ সালে রেড ক্রস প্রতিষ্ঠারও আগে বিভিন্ন সময়ে তাৎক্ষণিক প্রয়োজনে মানবসেবার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু সেসব উদ্যোগ ও তার সফলতা ছিল সাময়িক। কিন্তু হেনরি ডুনান্ট যে মানবিক প্রতিষ্ঠানের সূচনা করেছিলেন, তা ১৫৯ বছর পর আজও বহমান। এ যেন মানবতার সেবায় এক অবিরত অগ্রযাত্রা। আজ বিশ্ব রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট দিবসে তাই এ মহান ব্যক্তি তথা মানবতার অগ্রদূতকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি।

মন্তব্য করুনঃ

আপনার মন্তব্য করুন :