রাজশাহীতে মধুচক্রের ভয়ঙ্কর ডিজিটাল ফাঁদ

রাজশাহীতে মধুচক্রের ভয়ঙ্কর ডিজিটাল ফাঁদ

রাজশাহী

স্টাফ রিপোর্টারঃ

সহজে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার লোভে এখন নানা ধরনের ভয়ঙ্কর সব প্রতারণা হচ্ছে ডিজিটাল মাধ্যমে। বিশেষ করে রাজশাহী অঞ্চলে সময়ের সঙ্গে বাড়ছে প্রতারকের সংখ্যা। বদলাচ্ছে প্রতারণার ধরন। ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া ও মোবাইল ফোনে ওঁতপেতে থাকা প্রতারকরা নানা কৌশলে অর্থকড়ি হাতিয়ে নিয়ে নিঃস্ব করছে মানুষকে।

এক শ্রেণীর অর্থলিপ্সু নারী ও তাদের দোসর হিসেবে তথাকথিক অনলাইন সাংবাদিকদের সহযোগীতায় এসব প্রতারণা করে চলেছে বিভিন্নস্থানে। পুলিশের কতিপয় সদস্যও জড়িত এ প্রতারক চক্রের সঙ্গে। নারী লোভের ফাঁদে পা দিয়ে সর্বশান্ত হচ্ছে বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ। ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিও এসব প্রতারণা শিকার হচ্চেন অহরহ।

সর্বশেষ নারীর ফাঁদ পেতে বাড়িতে নিয়ে আটকে চাঁদাবাজির অভিযোগে নগরীর রাজপাড়া থানা পুলিশ নগরের কয়েরদাঁড়া এলাকা থেকে শীর্ষ চাঁদাবাজ রবিউল ইসলাম ও আরিফ হোসেন নামে দুজনকে গ্রেফতার করেছে। এক ব্যবসায়ীকে বাড়িতে আটকে রেখে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি, মারধর এবং প্রাণনাশের হুমকির ঘটনায় দায়েরকৃত একটি মামলায় বুধবার রাতে তাদের গ্রেফতার করা হয়।

পুলিশ জানায়, নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার খুদনান্দ গ্রামের মিলন ব্যাপারীর পুত্র আব্দুল কাদের বুধবার দুপুরে নগরীর লক্ষ্মীপুর পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসার জন্য আসেন। সেখানে এক মহিলা সঙ্গে তার পরিচয় হয়। ওই মহিলার অনুরোধে আব্দুল কাদের তার বাড়িতে গেলে ওই মহিলাসহ ৫ ব্যক্তি তাকে একটি ঘরে আটকে এক মহিলার সাথে নগ্ন ছবি তোলেন এবং তা প্রকাশ করে দেয়ার ভয় দেখিয়ে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে।

আব্দুল কাদের চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে তাকে বেদম মারধর করা হয়। একপর্যায়ে তার কাছে থাকা সাড়ে ৫ হাজার টাকা, বিকাশের সিম ও মানি ব্যাগ রেখে জীবননাশের হুমকি দিয়ে বিদায় করে দেয়া হয়। ঘটনার পর আব্দুল কাদের রাজপাড়া থানায় অভিযোগ করলে পুলিশ কয়েরদারা এলাকা থেকে জনৈক আয়েজ উদ্দিনের পুত্র রবিউল ইসলাম ও হারুনুর রশিদের পুত্র আরিফ হোসেনকে গ্রেপ্তার করে। ঘটনার অন্যতম আসামি রবিউলের স্ত্রীসহ অপর তিনজনকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

গ্রেপ্তার রবিউল দীর্ঘদিন থেকে এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত বলে পুলিশ জানিয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের বৃহস্পতিবার আদালতে চালান দেয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, এমন সব প্রতারণার ঘটনা অনেকে সামাজিক অবস্থানের কথা চিন্তা করে চেপে যাচ্ছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, অবস্থাটা এমন- যেন প্রতি এক গজ দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছে একেকজন প্রতারক।

তারা বলছেন, এদের খপ্পর থেকে দূরে থাকার একমাত্র মাধ্যম সচেতনতা। তথাকথিত সাংবাদিকরাও এ কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। নারী সংখ্যতা গড়ে তোলে তাদের মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে ম্যাজেঞ্জারের কথোপকথন কিংবা অডিও রেকর্ড করে তা ভুক্তভোগীদের কাছে পাঠিয়ে খবর করার ভয় দেখিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে টাকা। রাজশাহীতে এমন ঘটনা এখন অহরহ।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নানা কায়দায় প্রতারণার ফাঁদ পাতে এ চক্রের সদস্যরা। সাধারণত সহজ-সরল ও টাকাওয়ালা মানুষই তাদের লক্ষ্য। সুযোগ বুঝেই নানা ছলচাতুরী ও মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে তারা প্রতারণা করছে। এসব প্রতারণার মধ্যে কম খরচে বিদেশ পাঠানোর প্রলোভন, ঘরে ডেকে এনে জোর করে অশ্লিল ছবি তুলে তা ভাইরাল করার মত বিচিত্র ও অভিনব কৌশলে প্রতারণা করে এরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, যেসব মানুষ ভার্চুয়াল প্রতারণার শিকার হন, তাদের মধ্যে ৭০ ভাগই মামলা করতে চান না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, নানা ধরনের প্রতারণার ফাঁদ পেতে চারদিকে ওঁতপেতে রয়েছে নানা প্রতারক চক্র। ভয়ঙ্কর সব প্রতারণার অভিযোগ থাকলেও নেই প্রতিকার। মামলার পর গ্রেফতার হলেও দ্রুত জামিনে বেরিয়ে এসে আবারও বেপরোয়া হয়ে উঠছে চক্রের সদস্যরা। শুধু রাজশাহীতে শতাধিক প্রতারক এখন সক্রিয়।

এসব প্রতারণার শিক্ষার রাজনৈতিক নেতারাও পড়ছেন। সামাজিকভাবে মান ক্ষুন্ন হওয়ার ভয়ে তারা মামলা করতে চান না। কেউ মামলা করলেও তথাকথিক সাংবাদিকরা প্রতারক চক্রের হয়ে ফেইসবুকে নানা ধরনের অপপ্রচার চালাতে থাকেন। মুলত: ফেসবুকে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলা হয়। পরে বিয়ের প্রলোভনে নগ্ন ছবি তৈরি করে মেসেঞ্জারে পাঠিয়ে ওই ভুক্তভোগীদের কাছে টাকা দাবি করা হয়। না দিলে ইন্টারনেটে ছেড়ে দেয়ার হুমকি দেওয়া হয়।

সম্প্রতি সাইবার অপরাধবিষয়ক এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সাইবার অপরাধ তথা ভার্চুয়াল অপরাধ কমানো সম্ভব। সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও শক্তিশালী করা হচ্ছে। এখন পুলিশ অনেক শক্তিশালী বলেও তিনি জানান।

এদিকে রাজশাহী মহানগরীতে এখন অহরহই নারী দিয়ে পাতা হচ্ছে ফাঁদ। সক্রিয় রয়েছে বেশকিছু চক্র। এসব চক্রের নারী সদস্যরা কখনও প্রেমের ফাঁদে ফেলে কখনও সময় কাটানোর নামে টার্গেট করা ব্যক্তিকে বাসায় ডাকছেন। তারপর বাসায় গেলেই দেখানো হচ্ছে তাদের আসল রূপ।

‘ব্ল্যাকমেইল’ করে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে টাকা। সর্বশেষ এমন চক্রের ফাঁদে পড়েন একজন ব্যাংক কর্মকর্তা। তিনি রাষ্ট্রায়ত্ত এক ব্যাংকের রাজশাহীর একটি শাখার ব্যবস্থাপক। তাকে নারীচক্রের ভাড়া বাসা থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ।

রাজশাহীতে এমন ঘটনা ঘটেই চলেছে। স্থানীয় এক নেতার সঙ্গে প্রথমে সখ্যতা তারপর ভালোবাসার অভিনয় করে বিয়ে হয়। সবকিছুর পর আইনীভাবে তালাক দেওয়ার পরেও টাকার লোভে এখনও পিছু ছাড়ছে না এক নারী। প্রতিনিয়ত ওই নারী নানাভাবে হয়রানী করছেন স্থানীয় ওই নেতাকে।

এ নিয়ে প্রতারণার মামলা হলেও ওই নারী থেকে নেই। তার পক্ষ নিয়ে তথাকথিত অনলাইন ও ফেইসবুক সাংবাদিকরা নানাভাবে নানা অজুহাতে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার পায়তারা করছেন। নাম প্রকাশ না করা শর্তে ওই নেতা বলেন, প্রতারক নারীদের পক্ষ নিয়ে ঘটনার মুলে কিছু না জেনে দুর্বলতার সুযোগ খুজছে কথিত সাংবাদিকরা। এদের প্রতিরোধে মানুষকে সচেতন করা জরুরী বলেও মনে করেন ওই নেতা।

মন্তব্য করুনঃ

আপনার মন্তব্য করুন :