রাবিতে নিয়োগ বাণিজ্য: চক্রের ৫ কোটি, ভিসির ভাগে ৫০ লাখ!

রাবিতে নিয়োগ বাণিজ্য: চক্রের ৫ কোটি, ভিসির ভাগে ৫০ লাখ!

রাজশাহী

স্টাফ রিপোর্টারঃ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়মনীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ভিসির মেয়াদের শেষদিনে ১৪১ জনের বিশাল নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগ উঠেছে সদ্য বিদায় নেওয়া ভিসি ড. এম আব্দুস সোবহান চাকরি দেওয়ার নামে বিভিন্ন লোকের কাছে থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন ৫০ লাখ টাকা। এমনকি ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদেরকেও তিনি চাকরির আশ্বাস দিয়েছিলেন।

অভিযোগ উঠেছে, ঘুষ পেয়ে ও ছাত্রলীগের কতিপয় নেতাদের চাপেই এমন বিতর্কিত নিয়োগ দিয়েছেন তিনি। এই নিয়োগ না দিলে তিনি ক্যাম্পাস থেকে বের হতে পারতেন না বলেও শোনা যাচ্ছে। লাঞ্ছিত হতেন ক্যাম্পাসের ফটকেই। এই ভয়েই তিনি ছাত্রলীগের ২৫-৩০ জনকে দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির পদে নিয়োগ দেন। এঁদের ১৫ জনই তৃতীয় শ্রেণির। দু-একজন পেয়েছেন প্রথম শ্রেণির চাকরি।

পরিচয় গোপন রাখার শর্তে কয়েকজন জানান, নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীও আছেন। এটি করতে গিয়ে একটি চক্র নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে অন্তত পাঁচ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫০ লাখ টাকা গেছে ড. সোবহানের পকেটে।

নিয়োগপ্রাপ্ত রাবি ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতা বলেন, ‘আমাকে নিয়োগ দেওয়ার কথা ছিল প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা হিসেবে। কিন্তু নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তৃতীয় শ্রেণির পদে। এই রাগে নিয়োগপত্র ছিঁড়ে ফেলে ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে এসেছি।’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, ড. সোবহানের কাছ থেকে নিয়োগ আদায় করতে ছাত্রলীগের সাবেক নেতাকর্মীরা এক বছর ধরে চেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন। কিন্তু উপাচার্য গড়িমসি করে সময়ক্ষেপণ করছিলেন। এরমধ্যেই ক্যাম্পাসের বাইরের সরকার দলীয় নেতারাও চাকরির জন্য তাকে চাপ দিতে থাকেন।

এক পর্যায়ে তাঁর মেয়াদ (৬ মে) শেষ হওয়ার চার দিন আগেই উপাচার্যকে তাঁর বাসভবনে অবরুদ্ধ করে রাখেন। তাঁরা ৪ মের সিন্ডিকেট সভাও পণ্ড করে দেন। শেষমেশ গত বৃহস্পতিবার ড. সোবহান কোনোমতে ১৪১ জনকে নিয়োগ দিয়ে ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে যান। কিন্তু নিয়োগপ্রাপ্তদের তালিকা সামনে আসে উপাচার্য ক্যাম্পাস থেকে চলে যাওয়ার পর। সেই তালিকা দেখার পর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান অনেকে। কেউ কেউ নিয়োগপত্র ছিঁড়েও ফেলেন।

তালিকায় দেখা গেছে, নিয়োগ পাওয়া ১৪১ জনের মধ্যে ১১ জনকে শিক্ষক, ২৩ জনকে কর্মকর্তা, ৮৮ জনকে উচ্চমান সহকারী ও ৯ জনকে ইমাম হিসেবে অস্থায়ী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। রাবি প্রশাসনের একটি সূত্র জানিয়েছে, ভিসি নিয়োগের নথিতে সই করতে বললেও রেজিস্ট্রার আবদুস সালাম তাতে অস্বীকৃতি জানান। এরপর ড. সোবহান একজন ডেপুটি রেজিস্ট্রারকে দিয়ে নিয়োগপত্রে সই করিয়ে নেন।

তালিকা ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা গেছে, শিক্ষক পরিবারের তিন সদস্য শিক্ষক পদে নিয়োগ পেয়েছেন। যে বিভাগগুলোতে তাঁরা নিয়োগ পেয়েছেন, সেসব বিভাগের প্ল্যানিং কমিটিও নিয়োগের ব্যাপারে কিছু জানে না।

শিক্ষক পদে নিয়োগপ্রাপ্তদের একজন বাংলা বিভাগের খন্দকার ফরহাদ হোসেনের ছেলে ঋত্বিক মাহমুদ। তিনি সংগীত বিভাগে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। ওই বিভাগের প্ল্যানিং কমিটির সদস্য পদ্মীনি দে বলেন, ‘নিয়োগ নিয়ে বিভাগীয় প্ল্যানিং কমিটির কোনো সভা হয়নি। উপাচার্য কিভাবে নিয়োগ দিয়ে গেছেন, তা সবাই জানেন।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সিন্ডিকেট সদস্য এবং প্রাণ রসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম সাউদ বলেন, ‘শিক্ষক নিয়োগে বিভাগীয় প্ল্যানিং কমিটির সুপারিশ লাগে। এই নিয়োগে তা নেওয়া হয়নি। এই নিয়োগ অবৈধভাবে ও অনিয়মতান্ত্রিকভাবে হয়েছে।’

ছাত্রলীগের সাবেক নেতাদের মধ্যে যাঁরা চাকরি পেয়েছেন, তাঁদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি ইলিয়াস হোসেন, আতিকুর রহমান সুমন, সাবেক ছাত্রবৃত্তিবিষয়ক সম্পাদক টগর মো. সালেহ, বর্তমান সহসভাপতি মাহফুজ আলামিন, সুরনজিত প্রসাদ দীপ্ত, ফারুক হোসেন, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ও ছাত্রলীগ নেতা শামীম রেজা, ফিরোজ ও ডিল।

রাবি ছাত্রলীগের সহসভাপতি মাহফুজুর রহমান এহসান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, ‘ছাত্রলীগের কিছু জনকে চাকরি দিয়ে ছাত্রলীগের নাম ভাঙিয়ে যদি অন্যগুলো ব্যবসা হয়, তাহলে কী বলব? ছাত্রলীগের বেশির ভাগ নাকি নিম্নমান সহকারী! জুনিয়ররা বড় পোষ্টে, সিনিয়ররা নিম্নমান! সাংবাদিকরাও ছাত্রলীগ কোঠায়, বাহিরের মেয়েরাও ছাত্রলীগ কোঠায়!’

দুর্নীতিবিরোধী শিক্ষকদের ব্যানারে আন্দোলনকারী অধ্যাপক ইলিয়াছ হোসেন বলেন, ‘শিক্ষক হিসেবে যাঁদের নিয়োগ হয়েছে, তাঁদের বেশির ভাগের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। যেসব শিক্ষকের ছেলেকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো, তার ভিত্তি কী, আমাদের জানা নেই। এসব শিক্ষকের সঙ্গে উপাচার্যের ঘনিষ্ঠতা আছে।’

এসব বিষয় নিয়ে ড. আব্দুস সোবহানের মোবাইল ফোনে কয়েকবার চেষ্টা করা হয়। তবে তাঁর ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে।

মন্তব্য করুনঃ

আপনার মন্তব্য করুন :